কলকাতা: জগমোহন ডালমিয়া, কিছু মানুষ চলে গেলেও তাঁদের তৈরি করে দেওয়া পথ দীর্ঘদিন থেকে যায়। ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে জগমোহন ডালমিয়া তেমনই এক নাম। ক্রিকেটমহলে যিনি স্নেহের ‘জগুদা’ নামে পরিচিত ছিলেন, তাঁর প্রয়াণ দিবসে ফের ফিরে আসে ভারতীয় ক্রিকেটের এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের অধ্যায়।
১৯৪০ সালের ৩০ মে কলকাতায় জন্ম ডালমিয়ার। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। উইকেটকিপার হিসেবেও ক্রিকেট খেলেছেন। পরবর্তীতে পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত হলেও ক্রিকেট প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ক্রমশ গভীর হতে থাকে।
১৯৭৯ সালে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গল বা সিএবি-র প্রশাসনে যোগ দেওয়ার পর শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ ক্রিকেট প্রশাসনের পথচলা। সিএবি থেকে বিসিসিআই, সেখান থেকে এশীয় ক্রিকেট এবং শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের শীর্ষ পদে পৌঁছন তিনি।
১৯৮৩ সালে বিসিসিআইয়ের কোষাধ্যক্ষ হওয়ার পর প্রশাসক হিসেবে তাঁর দক্ষতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বড় আয়োজন ভারতে নিয়ে আসার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর। ১৯৮৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মাটিতে প্রথমবার বিশ্বকাপ আয়োজন ক্রিকেটের প্রচলিত ভৌগোলিক ধারণায় বড় পরিবর্তন আনে। ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপও উপমহাদেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।জগমোহন ডালমিয়া
তবে ভারতীয় ক্রিকেটে ডালমিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলির একটি ছিল ক্রিকেটের অর্থনৈতিক দিকটি নতুনভাবে দেখা। নব্বইয়ের দশকে সম্প্রচার স্বত্বের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। ১৯৯৩ সালে বেসরকারি টেলিভিশন সংস্থার কাছে সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির সিদ্ধান্ত ভারতীয় ক্রিকেটের অর্থনৈতিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচিত হয়।
এরপর ধীরে ধীরে ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয় আরও বড় বাণিজ্যিক পরিসর। সম্প্রচার, স্পনসরশিপ এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অর্থনৈতিক কাঠামোয় ভারতের গুরুত্বও বাড়তে থাকে। আজকের ভারতীয় ক্রিকেটের বিশাল বাণিজ্যিক পরিসর তৈরির প্রাথমিক পর্যায়ে ডালমিয়ার প্রশাসনিক ভূমিকা তাই বারবার আলোচনায় আসে।
১৯৯৭ সালে প্রথম ভারতীয় হিসেবে আইসিসির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন জগমোহন ডালমিয়া। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট প্রশাসনে ভারতের প্রভাব বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও তাঁর সময়কাল ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর কৌশলী প্রশাসনিক ভূমিকার জন্য ক্রিকেটমহলে তৈরি হয়েছিল আলাদা পরিচিতি।
ডালমিয়ার ক্রিকেটজীবনের সঙ্গে ‘কামব্যাক’ শব্দটিও যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। প্রশাসনিক বিরোধ, ক্ষমতার টানাপড়েন এবং আইনি জটিলতার মধ্যেও একাধিকবার তিনি ক্রিকেট প্রশাসনের মঞ্চে ফিরে এসেছেন। বিসিসিআই থেকে সরে যাওয়ার পর আবার সিএবি-র নেতৃত্বে প্রত্যাবর্তন করেন। ২০১৩ সালে বোর্ডের অস্থির সময়েও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
এরপর ২০১৫ সালে দীর্ঘ বিরতির পর ফের বিসিসিআই সভাপতি নির্বাচিত হন ডালমিয়া। কিন্তু দ্বিতীয় দফার এই প্রত্যাবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ওই বছরই অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। ২০ সেপ্টেম্বর প্রয়াত হন ভারতীয় ক্রিকেট প্রশাসনের এই প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।জগমোহন ডালমিয়া
ডালমিয়ার মৃত্যুর পর এক দশকে ক্রিকেটের চেহারা অনেকটাই বদলেছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, সম্প্রচারের ধরন পাল্টেছে, ক্রিকেটের বাণিজ্যিক পরিসরও আরও বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরির সময় যে প্রশাসকদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, তাঁদের তালিকায় জগমোহন ডালমিয়ার নাম আলাদা করে উচ্চারিত হয়।জগমোহন ডালমিয়া
তাই ‘জগুদা’কে স্মরণ করা শুধু একজন ক্রিকেট প্রশাসককে স্মরণ করা নয়। তাঁর প্রয়াণ দিবস ভারতীয় ক্রিকেটের সেই সময়টাকেও ফিরে দেখার সুযোগ দেয়, যখন মাঠের ক্রিকেটের পাশাপাশি প্রশাসন, সম্প্রচার ও অর্থনীতির ক্ষেত্রেও বদলে যাচ্ছিল গোটা খেলা।

