ময়নাগুড়ি: কোচবিহার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো লুকিয়ে দেখে (Basuniabari Puja Moinaguri) ফেলাই কাল হয়েছিল ধনবর বসুনিয়ার। রাজরোষের মুখে পড়ে রাজ্য ছাড়তে বাধ্য হওয়া সেই মানুষটির ভাগ্যের চাকা ঘুরেছিল নিজের পরিশ্রমে। বিত্তবান হয়ে উঠলেও রাজবাড়ির ‘বড়দেবী’র রূপ তিনি কোনোদিন ভুলতে পারেননি। অবশেষে ১৮১০ সালে আমগুড়িতে নিজের ভিটেতেই শুরু করেন দুর্গাপুজো। কোচবিহার রাজপরিবারের বড়দেবীর আদলেই গড়ে ওঠে প্রতিমা। ডুয়ার্সের অন্যতম প্রাচীন ময়নাগুড়ির আমগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের সেই বিখ্যাত বসুনিয়াবাড়ির পুজোই এবার গৌরবের ২১৬ বছরে পা দিল।
জন্মাষ্টমীর দিন পুজো দিয়ে প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হওয়া—এটিই এই বাড়ির দুই শতকের প্রাচীন রীতি, যার সামান্যতম ব্যত্যয় ঘটেনি আজও। শুক্রবার যথাযথ নিয়ম ও রীতি মেনে পুজো দিয়ে শুরু হয়েছে প্রতিমা তৈরির কাজ। জন্মাষ্টমীর পরদিন রাজবংশী সমাজের সনাতন প্রথা মেনে শিশু, কিশোর ও তরুণেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে শামিল হন চিরাচরিত ‘দধিকাদো’ উৎসবে। জাঁকজমক ও আড়ম্বরের কোলাহল এড়িয়ে এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবকে কেন্দ্র করে মেতে ওঠে গোটা গ্রাম।
এখানে মা দুর্গা পূজিতা হন ‘দেবী ঠাকুরানি’ হিসেবে। তিস্তাপারের এক সাধারণ রাজবংশী ঘরের বধূর আদলে গড়া হয় এই প্রতিমা। রক্তিম বর্ণের এই প্রতিমার মুখের গড়নে রয়েছে মঙ্গোলীয় জনজাতির স্পষ্ট ছোঁয়া। চাষিঘরের মেয়ে হওয়ায় দেবীর প্রতিমায় অলংকারের কোনো বাহুল্য থাকে না। পরনে থাকে গোড়ালির ওপর পর্যন্ত আটপৌরে শাড়ি।
শুরুটা অবশ্য মোটেও সহজ ছিল না। জঙ্গলঘেরা চাপগড়ে সেই সময়ে কোনো মৃৎশিল্পী, পুরোহিত বা ঢাকি পাওয়া যেত না। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের রংপুর থেকে ঘোড়ার গাড়িতে চেপে প্রতিমা নিয়ে আসা হতো। পরবর্তীতে ধনবরবাবুর ছেলে রংপুর থেকে মৃৎশিল্পী পরিবারকে আমগুড়িতে এনে নিষ্কর জমি দিয়ে স্থায়ীভাবে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। একইভাবে অসম থেকে এনে বসতি ও জমি দেওয়া হয় পুরোহিত ও ঢাকি পরিবারকেও।
এ দিন বসুনিয়াবাড়ির ঠাকুরদালানের বাইরে প্রতিমায় একমেটে মাটির প্রলেপ দেওয়ার কাজ শুরু করেন প্রবীণ মৃৎশিল্পী শ্রীমন্ত রায়। তিনি জানান, আগে তাঁর বাবা এই প্রতিমা তৈরি করতেন এবং গত ৩০ বছর ধরে তিনি নিজেই এই কাজ করে চলেছেন। এই প্রতিমার গড়ন একেবারেই আলাদা হওয়ায় কাজে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়।
কয়েক বছর ধরে পুজোর মূল দায়িত্বে ছিলেন পরিবারের কর্তা সুনীল বসুনিয়া। সম্প্রতি তাঁর প্রয়াণের পর বর্তমানে স্ত্রী চঞ্চলা বসুনিয়া, দুই দেওর দীপু ও তপন বসুনিয়া পুজোর সমস্ত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। পাশাপাশি এগিয়ে এসেছে চতুর্থ প্রজন্মও। ভাইপো দুলাল ও রোমিওরা এখন পুজোর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। চঞ্চলা দেবী জানিয়েছেন, জন্মাষ্টমীতে নিয়ম মেনে পুজো সম্পন্ন হয়েছে এবং শুরু হয়েছে পুজোর প্রস্তুতি। দুলালের কথায়, কোনো জাঁকজমক নয়, পরম নিষ্ঠাভরে পুজো করাটাই তাঁদের প্রধান আকর্ষণ এবং গোটা গ্রামই এই পুজোয় তাঁদের পরিবারের অংশ।

