পশ্চিমবঙ্গে গণপরিবহণে বড় উদ্যোগ, ১৫৮৯ কোটি টাকা বকেয়া কর আদায়ে অভিযান

পশ্চিমবঙ্গে গণপরিবহণে বড় উদ্যোগ, ১৫৮৯ কোটি টাকা বকেয়া কর আদায়ে অভিযান

কলকাতা, ৩ সেপ্টেম্বর: রাজ্যের পশ্চিমবঙ্গ গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, সাশ্রয়ী, সহজলভ্য এবং জনবান্ধব করে তুলতে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকারের পরিবহণ দফতর। যাত্রী পরিষেবার উন্নতির পাশাপাশি অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি, বকেয়া মোটর ভেহিকেল ট্যাক্স আদায় এবং সড়ক নিরাপত্তার উপরেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

যাত্রী অভিযোগে চালু হচ্ছে কন্ট্রোল রুম

যাত্রীদের অভিযোগ দ্রুত সমাধানের জন্য রাজ্যের বিভিন্ন স্টেট ট্রান্সপোর্ট ইউনিটে কাজের সময় ডেডিকেটেড কন্ট্রোল রুম চালু করা হবে। অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। কোনও অভিযোগের ক্ষেত্রে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হলে বিষয়টি দ্রুত সেখানে পাঠানো হবে।

অভিযোগ জানানোর জন্য নির্দিষ্ট নম্বরও প্রকাশ করা হয়েছে। NBSTC-এর নম্বর 9046229025, SBSTC-এর 7699993930, CTC-এর 8697733391/92, CSTC-এর 033-22360462/0463 এবং WBSTC-এর 9432597098।

১৫৮৯ কোটি টাকা বকেয়া কর

মোটর ভেহিকেল ট্যাক্স আদায়েও বিশেষ অভিযান শুরু করেছে পরিবহণ দফতর। VAHAN ডেটাবেস অনুযায়ী, রাজ্যে ৩ লক্ষ ৬২ হাজার ৬২২টি গাড়ির প্রায় ১,৫৮৯ কোটি টাকা কর বকেয়া রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে কর না দেওয়া এবং বেশি অঙ্কের বকেয়া থাকা গাড়ির মালিকদের ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। বকেয়া রাজস্ব দ্রুত আদায় করাই এই অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য।

মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে বাস পরিষেবা

পশ্চিমবঙ্গ গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে বাস পরিষেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন বাস রুট চালু এবং বর্তমানে চালু থাকা পরিষেবাগুলিকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।

জাতীয় ও রাজ্য সড়কে ই-রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পারস্পরিক পরিবহণ ব্যবস্থার মাধ্যমে আন্তঃরাজ্য বাস যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

সড়ক নিরাপত্তায় ৪.৩৫ কোটি টাকা

সড়ক নিরাপত্তাকেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে পরিবহণ দফতর। বিভিন্ন সড়ক নিরাপত্তামূলক কাজের জন্য পুলিশ কর্তৃপক্ষকে ৪.৩৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৭৬ কোটি টাকার বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা অর্থ দফতরের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।

অ্যাপ-ক্যাব পরিষেবা নিয়েও আলোচনা

অ্যাপ-ক্যাব সংস্থা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গেও বৈঠক করেছে পরিবহণ দফতর। সেখানে CNG সরবরাহ, ভাড়া সংশোধন, অ্যাগ্রিগেটরদের নিয়ম মেনে চলা, EV চার্জিং, যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা এবং চালকদের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বৈঠকের পর সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলিতে সময়সীমা মেনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পরিবহণ দফতরের লক্ষ্য হল রাজ্যজুড়ে একটি সাশ্রয়ী, নিরাপদ, সহজলভ্য, উন্নত যোগাযোগ-সমৃদ্ধ এবং জনকেন্দ্রিক গণপরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। নতুন উদ্যোগগুলির মাধ্যমে যাত্রী পরিষেবার মান আরও উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পরিষেবা উন্নতিতে আরও জোর

পরিবহণ দফতরের এই উদ্যোগগুলির লক্ষ্য শুধু নতুন পরিষেবা চালু করা নয়, যাত্রীদের দৈনন্দিন সমস্যাগুলির দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করাও। বাসের রুট, পরিষেবার সময়, ভাড়া, অভিযোগ এবং পরিবহণ সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে যাত্রীদের যাতে সহজে যোগাযোগের সুযোগ থাকে, সেই ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষ করে গণপরিবহণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও পরিষেবার মান দুটিকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন বাস রুট এবং আন্তঃরাজ্য যোগাযোগ বাড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষের যাতায়াত আরও সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। একইসঙ্গে ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলিতে যান চলাচল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আরও উন্নত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বকেয়া মোটর ভেহিকেল ট্যাক্স আদায়ের উদ্যোগের ফলে সরকারের রাজস্ব বাড়ার পাশাপাশি নিয়মিত কর প্রদানের প্রবণতাও বাড়তে পারে। অন্যদিকে সড়ক নিরাপত্তার জন্য বরাদ্দ অর্থ দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে ব্যবহার করা হবে।

পশ্চিমবঙ্গ গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি করার জন্য আগামী দিনেও একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

সাধারণ মানুষের জন্য কী বদলাবে?

পরিবহণ দফতরের নতুন উদ্যোগগুলির সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ যাত্রীদের উপর। অভিযোগ জানানোর জন্য নির্দিষ্ট কন্ট্রোল রুম থাকায় পরিষেবা সংক্রান্ত সমস্যার দ্রুত সমাধানের সুযোগ বাড়বে। নতুন বাস রুট এবং আন্তঃরাজ্য যোগাযোগ বাড়লে কর্মসূত্রে বা বিভিন্ন প্রয়োজনে যাতায়াত করা মানুষের সুবিধা হবে।

মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে বাস পরিষেবা চালুর উদ্যোগও গণপরিবহণ ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তায় অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ এবং ই-রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণের ফলে নিরাপদ যাতায়াতের পরিবেশ তৈরির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গ গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে পরিষেবা, নিরাপত্তা, যোগাযোগ এবং যাত্রী অভিযোগ—এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই একসঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা নিয়েছে পরিবহণ দফতর।